করোনাকালে দেশে ক্রেডিট কার্ডে গ্রাহকদের লেনদেন বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি

করোনাকালে দেশে ক্রেডিট কার্ডে গ্রাহকদের লেনদেন বেড়েছে। গত এক বছরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। তবে ওই সময়ে ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা খুব বেশি বাড়েনি। দেশে ৪টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ক্রেডিট কার্ড বাজারের বড় অংশ। মূলত অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্মের ওপর ভর করে ক্রেডিট কার্ডে গতির সঞ্চার হয়েছে। বিগত ২০২০ সালের জুনে দেশে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৯৩ হাজার ৬৯৭ জন। আর চলতি বছরের জুন শেষে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৯৯৬ জনে দাঁড়িয়েছে। ওই হিসাবে করোনাকালের এক বছরে ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৯৯টি। সেক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ। বিগত ২০২০ সালের জুনে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ৮৯৮ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের জুনে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে রেকর্ড ১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১৫ শতাংশ। অথচ ২০১৯ সালের জুনেও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের স্থিতি ছিল ৬ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। বর্তমানে উচ্চসুদের ওই ঋণের সাড়ে ৫ শতাংশ খেলাপি রয়েছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।


সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ক্রেডিট কার্ডের বাজারে গত বছরের শুরুতে করোনাসৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগের বড় ধাক্কা লেগেছিল। বাজার সম্প্রসারণ ও গ্রাহকদের কার্ড ব্যবহারের ওপর মহামারীর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু গত বছরের জুনের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বেড়ে চলেছে। মূলত করোনায় গৃহবন্দি মানুষ আগের তুলনায় ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে বেশি কেনাকাটা করেছে। পাশাপাশি কার্ড ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের প্রবণতাও বেড়েছে। দেশের সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী খাতের প্রায় অর্ধশত ব্যাংকের বর্তমানে ক্রেডিট কার্ড সেবা রয়েছে। তার মধ্যে বেসরকারি দ্য সিটি ব্যাংকেরই ক্রেডিট কার্ড সংখ্যা ৫ লাখ ৮ হাজার ৮৮৯। ব্যাংকটির দখলে ক্রেডিট কার্ড বাজারের ২৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। জুন শেষে ক্রেডিট কার্ডে সিটি ব্যাংকের ঋণ স্থিতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ গ্রাহক আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স) কার্ডধারী। তাছাড়া কার্ড সংখ্যা বিবেচনায় শীর্ষ পাঁচে থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও বিদেশী স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। দেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) মধ্যে কেবল লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। ক্রেডিট কার্ডের বাজারে ওই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান পঞ্চম।
সূত্র জানায়, দেশে ক্রেডিট কার্ডের জনপ্রিয়তা বাড়লেও সুদহার নিয়ে বাজারে নৈরাজ্য ছিল। কোনো কোনো ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩০ শতাংশেরও বেশি সুদ আদায় করতো। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদ ও সার্ভিস ফি নির্ধারণ করে দেয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদ ২০ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ওই প্রজ্ঞাপনের পর দেশের সব ব্যাংকই ক্রেডিট কার্ডের সুদহার কমিয়ে এনেছে। ফলে গ্রাহকের মধ্যে কার্ডভিত্তিক ঋণ সেবাটির জনপ্রিয়তাও বাড়ছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের বিশেষ ছাড় প্রত্যাহার করে নিয়েছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে বিধি-নিষেধের (লকডাউন) সময় ওই ছাড় দেয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় (এমএফএস) ব্যক্তিপর্যায়ে সর্বোচ্চ মাসিক লেনদেনের সীমা ২ লাখ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে সার্কুলার জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন সাপেক্ষে দোকানপাট ও শপিংমল খোলাসহ গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের মেয়াদ, লেট পেমেন্ট ফি ও সুদ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের ২০১০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের জন্য নির্ধারিত সর্বশেষ তারিখের অব্যবহিত পরের দিন হতে ক্রেডিট কার্ডের অপরিশোধিত বিলের ওপর সুদ বা মুনাফা আরোপযোগ্য হবে। সেক্ষেত্রে কোনোভাবেই লেনদেনের তারিখ হতে সুদ আরোপ করা যাবে না। বিলম্বে পরিশোধিত কোনো বিলের বিপরীতেও বিলম্ব ফি একবারের বেশি আদায় করা যাবে না। যদিও বিধিনিষেধ চলাকালে ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ না করলেও লেট পেমেন্ট ফি আরোপে নিষেধাজ্ঞা ছিল। পাশাপাশি বকেয়া বিল নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ার পর ৫ কর্মদিবস পর্যন্ত পরিশোধের সুযোগ পেতো গ্রাহক। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় বিল পরিশোধের মেয়াদ, লেট পেমেন্ট ফি ও সুদ সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধার নির্দেশনা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে ক্রেডিট কার্ড সংখ্যা ও ঋণ বিতরণের দিক থেকে সিটি ব্যাংকের অবস্থান সবার শীর্ষে। আর ক্রেডিট কার্ড বিপণনের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার। ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ড ঋণের স্থিতি ৭৯০ কোটি টাকা। কার্ড সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড। বাজারে ওই ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজারেরও বেশি। কার্ডধারীদের মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৫৮৯ কোটি টাকা। গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে চতুর্থ স্থানে থাকা ব্যাংক হলো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। বহুজাতিক ওই ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের ঋণের স্থিতি ৭৫০ কোটি টাকা। তাছাড়া দেশের ৩৪টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শুধু লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। বাজারে ওই প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের তুমুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। দেশের বড় বড় ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ক্রেডিট কার্ড বিপণন করা লংকাবাংলার অবস্থান পঞ্চম। জুন শেষে লংকাবাংলার ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬১০। ওই গ্রাহকদের কাছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির ৪০৭ কোটি টাকা ঋণ স্থিতি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন জানান, ক্রেডিট কার্ড সংখ্যা ও ঋণ বিতরণের দিক থেকে সিটি ব্যাংকের অবস্থান সবার শীর্ষে। তবে সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৫০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। দ্রুতততম সময়ের মধ্যে দেশের গ্রাম-গঞ্জে সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পৌঁছে দেয়া হবে। সেজন্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পে’র সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড হবে কিউআর কোডভিত্তিক। আর গ্রামের বাজারে থাকা সিটি ব্যাংকের এজেন্টদের কাছেও ক্রেডিট কার্ড পাওয়া যাবে।

 25 total views,  1 views today

প্রকাশিত সংবাদ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি,পাঠকের মতামত বিভাগে প্রচারিত মতামত একান্তই পাঠকের, তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়।
Top