৯/১১ হামলার বিশ বছর: সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ লড়াই

ব্রিটিশ লেখক এইচ জি ওয়েলস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘এটি এমন এক যুদ্ধ, যা আর সব যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে।’ শতাব্দীকাল পরেও যুদ্ধমুক্ত হয়েছে কি বিশ্ব? আজ যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার ২০ বছর পূর্তি। শোক ও ক্রোধের কান্নায় নানা আয়োজনে দিনটি স্মরণ করছে দেশটি। ওই হামলার জেরে দুই দশক আগে তারা আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, গত আসস্টে তারও সপ্তাপ্তি টানা হয়েছে। তবে সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসী হামলার হুমকি থেকে না যুক্তরাষ্ট্র, না বিশ্ব- কেউই মুক্ত হতে পারেনি। তাহলে দীর্ঘতম যুদ্ধ থেকে কী ফল পেল যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের গণতান্ত্রিক পশ্চিমা মিত্ররা? সন্ত্রাসবাদ কি শেষ? বরং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে নানা রূপে আজও তা বৈশ্বিক হুমকি ও উদ্বেগের কারণ।

১৯১৪ সালের ১৪ আগস্ট ‘দ্য ডেইলি নিউজে’ এইচ জি ওয়েলসের নিবন্ধে যুদ্ধের সমর্থনে লেখা শক্তিশালী কিন্তু বিতর্কিত বাক্যটিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ন্যায্যতার পক্ষে রাজনৈতিক ঢাল করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। একই সঙ্গে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে সামনে এনেছিলেন। ১৯১৭ সালে তিনি বলেছিলেন, এই যুদ্ধ বিশ্বে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে নিরাপত্তা দেবে। এর পাঁচ বছর পর স্প্যানিশ-আমেরিকান দার্শনিক জর্জ সানটায়ানা বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ শেষে শুধু মৃত্যু দেখা যায়।’ আফগান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই। ৯/১১ হামলার বদলা হিসেবে আফগানিস্তানে ২০ বছরের একতরফা যুদ্ধের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আড়াই হাজার সেনা নিহত হয়েছেন। এই যুদ্ধে এর চেয়ে অনেক বেশি মরেছেন নিরীহ আফগান।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার- এই দুই স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ বিংশ শতাব্দীজুড়ে অনেক যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একবিংশ শতকের গোড়ায় তাদের নেতৃত্বেই নতুন মোড়কে আসে সন্ত্রাসবাদবিরোধী বৈশ্বিক লড়াই। এর সূত্রপাত হয় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ও সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগনে আল কায়দার ভয়ংকর হামলার পর। শীর্ষ পরাশক্তির দেশের বুকে এ ধরনের বহিঃআক্রমণে হতভম্ভ হয় পুরো বিশ্ব।

বিশ বছর আগে এমনই ক্রোধাত্মক শোকের অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বিশ্ব থেকে সন্ত্রাসবাদের গোড়া উপড়ে ফেলতে আফগান যুদ্ধের ঘোষণা করেছিলেন।

কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আল কায়দার সঙ্গে আমাদের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কিন্তু এখানেই এর শেষ নয়। বিশ্বের প্রতিটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী খুঁজে বের করা, তাদের থামানো ও পরাজিত না করা পর্যন্ত এ যুদ্ধ শেষ হবে না।’ এই বুশই ২০০৩ সালে এসে মানবতার জন্য হুমকিমূলক কর্মকাণ্ড ও সন্ত্রাসবাদের জন্য ইরাকে হামলা করেছিলেন। একই কারণে তার উত্তরসূরি বারাক ওবামা লিবিয়ায় হামলা চালান।

শতাব্দীকালজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ভুল প্রমাণিত হয়েছে উড্রো উইলসনের অবস্থান। আসলে যুদ্ধ শেষ হয় না, বরং একেকটি যুদ্ধ নতুন নতুন যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করে রেখে যায়। আফগান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণার পর এখন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ভাবতে হচ্ছে অন্য জঙ্গিদের নিয়ে। কারণ আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখল করায় তাদের দোসর আল কায়দাসহ এশিয়া, আফ্রিকা এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঝিমিয়ে পড়া জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠন নানা রূপে মাথা চাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। গতকালও এর প্রমাণ মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের প্রধান সঙ্গী যুক্তরাজ্যের এক মন্ত্রী বলেছেন, ৯/১১ তারিখ ঘিরে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ বিশ বছর ধরে সন্ত্রাসের বিরদ্ধে যুদ্ধ করলেও লক্ষ্য অর্জনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আজও হামলার শঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

আলজাজিরার এক বিশ্নেষণে বলা হয়েছে, ৯/১১ হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো দেশগুলোর ২০ বছরের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ফলে কট্টরপন্থি জঙ্গিগোষ্ঠী আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। হামলার সক্ষমতাও কমেছে। তবে উগ্রপন্থিরা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। একই মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল গ্রুপগুলো নতুন করে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় মাথাচাড়া দিচ্ছে। আল কায়দার ভাবাদর্শে বিশ্বাসী জঙ্গিগোষ্ঠী আল-শাবাব আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে খুন-গুম করে চলেছে।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে দাবি করে আল কায়দার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকে। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে অভিযানে নিহত হয় বিন লাদেন। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে আল কায়দার অনেক জঙ্গি নেতাও নিহত হয়েছে। তারপরও এই জঙ্গি নেটওয়ার্ক নিশ্চিহ্ন হয়নি। এখনও ১৭টির মতো দেশে তাদের শাখা বা সহযোগী গ্রুপ তৎপর রয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান শাসন ফেরায় তাদের উল্লাস করতেও দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ব্রুস হফম্যান বলেছেন, ‘২০ বছর ধরে একটি বিষয় দেখা গেছে। যখন কোনো অঞ্চলে সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা শুরু হয়, তখন সন্ত্রাসীরা অন্য অঞ্চলে গিয়ে সক্রিয় হয়।’ তিনি আরও বলেন, কট্টরপন্থি গ্রুপগুলো বিশ্বের কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত নেই। ভৌগোলিকভাবে তাদের বিস্তার হচ্ছে। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবিলা করা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের গোষ্ঠীগুলো ভয়ংকর কোনো হামলা চালাতে সক্ষম না হলেও বারবার তাদের স্থান বদল সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রধান অন্তরায়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইন্টারন্যাশনাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সেথ জি জোনস বলেছেন, ‘২০০১ সালের চেয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখন আরও বেশি স্থানে সক্রিয়।’

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সেনা প্রত্যাহারের ঘটনা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য ছড়িয়ে পড়ার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগান যুদ্ধ শেষ করলেও বাইডেন জোর দিয়ে বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। আজ ৯/১১ হামলার ২০ বছর পূর্তিতে তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। সেখানেও হয়তো একই প্রতিশ্রুতি শোনাবেন।

তবে সারি সারি সমাধির সামনে দাঁড়ানো স্বজনদের দেখে হয়তো অনেকের মনে পড়বে কালজয়ী দার্শনিক হেরোডোটাসেরই সেই বিখ্যাত কথা- ‘যখন শান্তি থাকে তখন সন্তানরা বাবাকে সমাধিস্থ করে। আর যখন যুদ্ধ চলে তখন বাবারা ছেলেদের সমাধিস্থ করেন।’

গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে যে, তালেবান সরকার নাইন-ইলেভেনেই শপথ নিচ্ছে। তা যদি হয়, তাহলে দিনটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও গ্লানির হবে। সূত্র :দ্য পলিটিকো, এএফপি, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ও আলজাজিরা।

 37 total views,  2 views today

প্রকাশিত সংবাদ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি,পাঠকের মতামত বিভাগে প্রচারিত মতামত একান্তই পাঠকের, তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়।
Top