সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ থাকায় বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে

আমাদের সংবাদ ডেস্ক: দীর্ঘ দু’বছর ধরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়াধীন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইপিএইচ) দু’বছর ধরে স্যালাইন ও ব্লাড ব্যাগ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অথচ ইতিপূর্বে আইপিএইচ সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বল্পমূল্যে আইভি ফ্লুইড স্যালাইন সরবরাহ করে আসছিল। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ থাকায় কয়েকটি বসরকারি প্রতিষ্ঠান তার সুবিধা নিচ্ছে। ওসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ৬-৭ গুণ, এমনকি কোনে কোনো ক্ষেত্রে ১০ গুণ বেশি দামে ওই স্যালাইন বিক্রি হচ্ছে হচ্ছে। অথচ ১২-১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানাটি আধুনিকায়ন করে ৩ মাসের মধ্যেই উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকায় স্যালাইন উৎপাদন প্ল্যান্টের কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় অকেজো হওয়ার পথেওসব যন্ত্রপাতি। বিষয়টি আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দ্রুত আধুনিকায়ন করে আইপিএইচের স্যালাইন উৎপাদন প্ল্যান্ট পুনরায় চালুর সুপারিশ করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আইপিএইচতে স্যালাইন ও ব্লাড ব্যাগ উৎপাদনের মানসম্মত চর্চা (জিএমপি) নেই’এমন কৌশলী অভিযোগে সরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ বিগত ২০১৯ সালের আগস্টে বন্ধের আগে আইপিএইচের তৈরি ৫০০ সিসির এক প্যাকেট গ্লুকোজ স্যালাইন যখন বিক্রি হতো ২৫ টাকায়, তখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একই স্যালাইন বিক্রি হতো ৬৫ টাকায়। আইপিএইচের উৎপাদন বন্ধ থাকায় এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্যালাইনের দাম বেড়ে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে আইপিএইচের ১ হাজার সিসির স্যালাইন ৪২ টাকায় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একই স্যালাইন বিক্রি হতো ৮০ টাকায়। তাছাড়া ৫০০ সিসির নরমাল স্যালাইন আইপিএইচ বিক্রি করতো মাত্র ২৫ টাকায়। আর একই স্যালাইন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করতো ৬৫ টাকায়। বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তা ৮০ টাকায় বিক্রি করছে। ৩ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড ৫০০ সিসির স্যালাইন আইপিএইচ বিক্রি হতো ৪২ টাকায়। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেশে ওই স্যালাইন তৈরি না করায় তা চোরাইপথে এনে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, দীর্ঘ অর্ধশত বছর ধরে আইপিএইচে ২২ ধরনের স্যালাইন, ব্লাডব্যাগ, ট্রান্সফিউশন সেট উৎপাদন হচ্ছিল। তাতে বছরে ১ লাখের বেশি ব্লাডব্যাগ তৈরি হতো, যা দেশের মোট চাহিদার ৭ ভাগের এক ভাগ। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের ১৪ থেকে ১৭ লাখ স্যালাইন উৎপাদন করতো। আর ওসব স্যালাইন আইপিএইচ কম দামে সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করতো। ফলে দামের প্রতিযোগিতায় স্যালাইন উৎপাদনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পেরে উঠছিল না। দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের ৬১ শতাংশই ওষুধে ব্যয় হচ্ছে। তার মধ্যে আইভি ফ্লুইডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়।
সূত্র আরো জানায়, আইপিএইচে ডায়াগনস্টিক রিএজেন্ট ল্যাবরেটরিতে ২১ প্রকারের রি-এজেন্ট প্রস্তাত করা হতো। আর সেগুলো দেশের সব সরকারি হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করতো আইপিএইচ। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ থাকায় স্যালাইন, ব্লাড ব্যাগ ও রি-এজেন্ট উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামাল, ফিনিশ্ড প্রডাক্ট প্রচুর পরিমাণে মজুত রয়েছে এবং ওসব পণ্য উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত দক্ষ জনবলও বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে আইপিএইচ সংশ্লিষ্টদের মতে, আইপিএইচের স্যালাইন কারখানাকে আধুনিকভাবে গড়ে তোলা জরুরি। আইপিএইচের মূল কাঠামো ১৯৫৩ সালে স্থাপিত হলেও আইভি ফ্লুইড উৎপাদন ইউনিট ১৯৭২-৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। আইপিএইচে কলেরা স্যালাইন-১০০০ সিসি ও ৫০০ সিসি, গ্লুকোজ স্যালাইন-১০০০ সিসি ও ৫০০ সিসি, গ্লুকোজ অ্যাকোয়া স্যালাইন ১০০০ সিসি ও ৫০০ সিসি, নরমাল স্যালাইন ১০০০ সিসি ও ৫০০ সিসি, হেমোডায়ালাইসিস-১০০০ সিসি, হার্টসম্যান সলিউশন-১০০০ সিসি, ৩% সোডিয়াম ক্লোরাইড-৫০০ সিসি, স্যালাইন গিভিং সেট, ব্লাড ব্যাগ-৩৫০ সিসি ও ৪৫০ সিসি, ব্লাড ট্রান্সফিউশন অ্যান্ড ইনফিউশন সেট উৎপাদন করা হতো।
আর বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম সফিউজ্জামান মনে করেন, বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করা ঠিক নয়।
অন্যদিকে আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে করোনার টিকা বোতলজাত শুরু করারও তাগিদ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ইতিমধ্যে দেশে করোনার টিকা উৎপাদনের বিষয়ে সংসদীয় কমিটি একটি কমিটি গঠন করেছে। দেশে সরকারিভাবে করোনা ভাইরাসের টিকা উৎপাদনে একটি পূর্ণ পরিকল্পনার বিষয়ে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে স্থায়ী কমিটি ওই কমিটিকে সুপারিশ করেছে।
এ প্রসঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানায়, পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়আইপিএইচের স্যালাইন কারখানায় উৎপাদনের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। সেজন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার পর সংশোধন না হওয়ায় লাইসেন্স স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আইপিএইচের প্ল্যান্টটি আধুনিকায়ন ও স্বাস্থ্যসম্মত করা হলে পুনরায় উৎপাদনের অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।
আর একই বিষয়ে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম সফিউজ্জামানের মতে, বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। সেজন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ি করা ঠিক নয়।

 14 total views,  1 views today

প্রকাশিত সংবাদ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি,পাঠকের মতামত বিভাগে প্রচারিত মতামত একান্তই পাঠকের, তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়।
Top