যেভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক পরিদর্শক সোহেল রানা

বনানী থানার বরখাস্ত পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানাকে নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়। খোদ পুলিশের কর্মকর্তারাও বিস্মিত তার অঢেল সম্পদের কথা শুনে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন- কীভাবে এত অর্থবিত্তের মালিক হলেন তিনি? কথিত অনলাইন মার্কেট প্লেস ই-অরেঞ্জের মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার আগেই বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন স্থানেও তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এই পুলিশ কর্মকর্তা এখন পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ থানা পুলিশের হেফাজতে। পালিয়ে নেপাল যাওয়ার পথে চেংড়াবান্ধা সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেপ্তারের পর অনুপ্রবেশের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঢাকার পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, শেখ সোহেল রানা প্রায় একযুগ ধরে পুলিশের গুলশান ক্রাইম জোনে কর্মরত। একসময় তিনি ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি জোনেও কাজ করেছেন, ছিলেন গুলশান থানার অপারেশন অফিসারও। পাঁচ বছর আগে পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েক মাস অন্যত্র চাকরি করলেও ‘তদবির করে’ পোস্টিং নিয়েছেন বনানী থানায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গুলশান-বনানী এলাকায় কাজ করার কারণে তার সঙ্গে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের দূতাবাসের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে জনশক্তি রপ্তানিকারক কয়েকটি এজেন্সির সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তিনি। নির্দিষ্ট অংকের অর্থের বিনিময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসা পেতে সহায়তা করতেন। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন দূতাবাসের সঙ্গে শেখ সোহেল রানার ভালো সম্পর্ক ছিল। এমনকি ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তার ভিসা পেতেও সহযোগিতা করেছেন তিনি। জনশক্তি রপ্তানিকারক সুনির্দিষ্ট কয়েকটি এজেন্সি শেখ সোহেল রানার মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করত । প্রতিটি ভিসার জন্য শেখ সোহেল রানা ৮ হাজার ইউরো নিতেন। সোহেল রানার মাধ্যমে ভিসার আবেদন করলে নিশ্চয়তাও ছিল শতভাগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বলেন, প্রতিটি দূতাবাসে দিনে বা সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পাসপোর্ট জমা নেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে কোন প্রতিষ্ঠান কতটি পাসপোর্ট জমা দেবেন তার নির্দিষ্ট কোটাও রয়েছে। এর বাইরে দূতাবাসের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে বিশেষ কোটায় পাসপোর্ট জমা দেওয়া যায়। এই সুযোগটিই নিতেন সোহেল রানা। এভাবেই তিনি পাসপোর্ট প্রতি নির্দিষ্ট অংকের টাকা নিতেন।
নেপাল থেকে ইউরোপ যাওয়ার লক্ষ্য: এদিকে ই-অরেঞ্জের মাধ্যমে শত কোটি টাকা আত্মসাতের পর নেপাল হয়ে পালিয়ে ইউরোপ যেতে চেয়েছিলেন আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্টরা জানান, সোহেল রানা নিয়মানুযায়ী অফিসিয়াল পাসপোর্ট ব্যবহারের কথা থাকলেও তার পাসপোর্ট ছিল ব্যক্তিগত। এই পাসপোর্টে ইউরোপের শেনজেন, আমেরিকা ও থাইল্যান্ডের ভিসা লাগানো রয়েছে। সোহেল রানা চেয়েছিলেন নেপাল থেকে ইউরোপে ঢুকতে। ইউরোপের পর্তুগালে তিনি এক বন্ধুর মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন। এ ছাড়া থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যেও অর্থ বিনিয়োগ রয়েছে তার।
ই-অরেঞ্জ থেকে নানা কৌশলে টাকা উত্তোলন: আলোচিত ই-অরেঞ্জের গ্রাহকদের দায়ের করা মামলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানা কৌশলে ই-অরেঞ্জের ব্যাংক হিসাব থেকে গ্রাহকদের টাকা তুলে নিয়েছেন তিনি। শেখ সোহেল রানা নিজেই সিটি ব্যাংকের একটি হিসাব থেকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া তার বান্ধবী অদিতি নামে এক তরুণীর মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব টাকা তিনি দেশের বাইরে পাচার করেছেন।
দৃষ্টি সরাতে মামলার কৌশল: সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ই-অরেঞ্জ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গত ১২ আগস্ট তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলাটি দায়ের করেন ই-অরেঞ্জের সিওও আমান উল্লাহ চৌধুরী। ওই মামলায় তিনি ই-অরেঞ্জের সাবেক সিওও নাজমুল হাসান রাসেল, তার বাবা খলিলুর রহমান, স্ত্রী ফারিয়া সুবহাসহ কয়েকটি মোটরবাইক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে কয়েক শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। তবে এ-সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, টিভিএস, হোন্ডা ও বাজাজ মোটরবাইকের সরবরাহকারী হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করেছে, তারাই উল্টো ই-অরেঞ্জের কাছে টাকা পাওনা রয়েছে। পণ্য ডেলিভারি নিয়ে ই-অরেঞ্জ তাদের অর্থ পুরোপুরি পরিশোধ করেনি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, শেখ সোহেল রানা তার প্রভাব খাটিয়ে এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন। তবে সাধারণ গ্রাহকরা আন্দোলন করায় পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। সাধারণ গ্রাহকদের একজনের মামলায় ই-অরেঞ্জের অন্যতম মালিক শেখ সোহেল রানার বোন সোনিয়া মাহবাজিন, সোনিয়ার স্বামী মাসুকুর রহমান এবং আগের মামলার বাদী আমান উল্লাহ চৌধুরী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। পুলিশের গুলশান জোনের উপকমিশনার আসাদুজ্জামান জানান, ই-অরেঞ্জের সঙ্গে সোহেল রানার সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘সোহেল রানাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত হচ্ছে। অপরাধ করলে তিনি পুলিশ সদস্য হলেও কোনও ছাড় পাবে না।

 33 total views,  1 views today

প্রকাশিত সংবাদ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি,পাঠকের মতামত বিভাগে প্রচারিত মতামত একান্তই পাঠকের, তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়।
Top