ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে উৎপাদন পর্যায়েই বিপুল পরিমাণ ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে

ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে উৎপাদন পর্যায়েই বিপুল পরিমাণ ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর প্রতি বছর উৎপাদন পর্যায়ে যে পরিমাণ ধান নষ্ট হচ্ছে তা প্রতিরোধ করা গেলে খুব সহজেই চালের আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কারণ ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান অনেক সুদৃঢ়। কিন্তু নানা কারণে ধানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শুধু উৎপাদন পর্যায়েই নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে ৬৭ লাখ টন চাল নষ্ট হচ্ছে। ওই ক্ষতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন বাড়তি চাল পাওয়া সম্ভব। আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত বছরে সর্বোচ্চ চাল আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯ লাখ টন। ওই হিসেবে নষ্ট হওয়ার মাত্রাকে সহনীয় করে আনা গেলেই চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারতো বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ধান উৎপাদনে এদেশের সনাতনী উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাতের পাশাপাশি ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের দিক থেকেও দুর্বলতা রয়েছে। ফলে উৎপাদন পর্যায়েই প্রধান খাদ্যশস্য ধান প্রচুর পরিমাণ নষ্ট হচ্ছে। বিগত ২০১১-১৬ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে শুধু উৎপাদন পর্যায়েই ধানের গড় ফলন নষ্ট হয়েছে ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর ২০১৬-২০ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে নষ্ট হয়েছে ১৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। মূলত ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণেই সবচেয়ে বেশি ধান নষ্ট হচ্ছে। শুধু ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকার কারণে প্রতি বছর নষ্ট হওয়া ধানের ৪৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে। আর মোট নষ্ট হওয়া ধানে পরিবেশগত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণের অবদান ১৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তাছাড়া কৃষকের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণেও ২০ দশমিক ২৯ এবং জাতের দুর্বলতার কারণে ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ ধান নষ্ট হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বিগত ৫ বছরে দেশে মোট ১৭ কোটি ৭৮ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। তার মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ কোটি ৪৭ লাখ টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ কোটি ৩৮ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ কোটি ৬৩ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ কোটি ৬৪ লাখ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ কোটি ৬৬ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। ওই হিসাবে দেশে গত ৫ বছরে চাল উৎপাদনের বার্ষিক গড় পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৫৬ লাখ টন। গড়ে প্রতি বছর ১৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ হারে চাল নষ্ট হওয়ার কারণে দেশ বার্ষিক গড়ে প্রায় ৬৭ লাখ টন চাল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাছাড়া ধান কেটে চাল বের করে আনার আগ পর্যন্ত ৬টি ধাপে উৎপাদিত চালের ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে। তার মধ্যে ধান কাটার সময় ১-৩ শতাংশ, হ্যান্ডলিংয়ের সময়ে ২-৭ শতাংশ, থ্রেশিং বা মাড়াইয়ে ২-৬ শতাংশ, শুকানোয় ১-৫ শতাংশ, গুদামজাতে ২-৬ শতাংশ ও পরিবহনে ২-১০ শতাংশ চাল অপচয় হচ্ছে। তার মধ্যে আর্দ্রতা অনুধাবনে কৃষকের সনাতন পদ্ধতি অনুসরণকে কাটার সময় ধান নষ্ট হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কৃষকরা এখন ধান কাটার আগে ময়েশ্চার মিটার মেশিন দিয়ে পরিবেশের আর্দ্রতা পরিমাপ করে নিচ্ছে। কিন্তু এদেশের কৃষকরা এখনো ধান কাটার আগে দাঁতে কামড় দিয়ে বা দৃশ্যমান অভিজ্ঞতার আলোকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক ওই পদ্ধতি অনুসরণে মোট ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সঠিক আর্দ্রতায় ধান কেটে তা মাড়াই ও ভাঙানো হলে প্রতি মণ ধান থেকে ২৮-৩০ কেজি চাল পাওয়া সম্ভব। কিন্তু দেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক আর্দ্রতায় ধান কাটা হয় না। ফলে প্রতি মণ ধান থেকে ২৫-২৭ কেজির বেশি চাল পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সূত্র আরো জানায়, ধান উৎপাদন ও কাটা থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে নষ্টের কারণে দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। ব্যবস্থাপনাগত পদ্ধতির উন্নয়ন ও যান্ত্রিকীকরণ করতে পারলে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। তাছাড়া ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে দেশের আমদানিনির্ভরতাও কমিয়ে আনা যায়। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তরুণ কর্মসংস্থানকে এগিয়ে নেয়া সম্ভাবনাও রয়েছে। সেক্ষেত্রে ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব, বিশেষ করে কৃষিতে সরকারকে আরো আর্থিক ও নীতিসহায়তা প্রয়োজন।
এদিকে দেশে ধানের ফলন পার্থক্য ও নষ্টের পরিমাণ গত কয়েক দশকে কমে এসেছে। ব্রি’র পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী ১৯৭১-৭৫ পর্যন্ত ৫ বছরে ধানের ফলন ক্ষতির হার ছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। পরের ৫ বছরে তা ছিল ৩৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ত্ছাড়া ১৯৮১-৮৫ সাল পর্যন্ত নষ্ট হয়েছে ৩১ দশমিক ৮৮ শতাংশ, পরের ৫ বছরে ২৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও ১৯৯১-৯৫ সাল পর্যন্ত নষ্ট হয়েছে ২৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। তাছাড়া ১৯৯৬-২০০০ সালের মধ্যে ২৬ দশমিক ১৮ শতাংশ, ২০০১-০৫ পর্যন্ত ২৪ দশমিক ২৯ শতাংশ ও ২০০৬-১০ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ২২ দশমিক ৩৯ শতাংশ হারে ধান নষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে ব্রি মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর জানান, দেশে ধানের ফলন নষ্টের পেছনের প্রধান কারণ ব্যবস্থাপনা ত্রুটি। সেটি কমিয়ে আনতে জাত উদ্ভাবন পর্যায় থেকে শুরু করে কৃষক পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতার সম্প্রসারণ জরুরি। বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন ও জাপানে ফলন পার্থক্য মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। এদেশে যদি ধান ফলন নষ্টের পরিমাণ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়, তাহলে কমপক্ষে ৫০ লাখ টন বাড়তি চাল পাওয়া যেতো। ধানের ফলন পার্থক্য কমিয়ে আনতে ব্রি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তার আওতায় ২০৫০ সালের মধ্যে ফলন নষ্টের হার সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে আনা হবে। সেটি করা সম্ভব হলে ও ধারাবাহিক উৎপাদন বৃদ্ধিকে হিসাবে নিয়ে বলা যায়, ওই সময় ৮০ লাখ টন বাড়তি চাল পাওয়া যাবে। ব্যবস্থাপনা উন্নতির মাধ্যমে বাড়তি চাল পাওয়া গেলে যেমন অন্যান্য শস্য আবাদের জন্য জমি ছেড়ে দেয়া সম্ভব হবে, তেমনি দেশের খাদ্যস্বয়ম্ভরতাও টেকসই হবে।

 32 total views,  1 views today

প্রকাশিত সংবাদ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি,পাঠকের মতামত বিভাগে প্রচারিত মতামত একান্তই পাঠকের, তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়।
Top