টাঙ্গাইলের জমিদারবাড়ি

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে যে ক’টি জমিদারবাড়ি সমৃদ্ধ ইতিহাসের সঙ্গে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে টাঙ্গাইল জেলায় বেশ কয়েকটি রয়েছে। আজ থাকছে সেসব কালের সাক্ষী হয়ে থাকা স্থাপত্যশৈলীর কথা।

মহেড়া জমিদারবাড়ি
গ্রামের মধ্য দিয়ে পিচঢালা পথ বয়ে গেছে। চারপাশটা সবুজে আচ্ছাদিত। মূল ফটকের কাছে এসেই অনুভব করবেন বীরদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা জমিদারবাড়ির সৌন্দর্য। জনপ্রতি টিকিট ৮০ টাকা। এক হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর এই মহেড়া জমিদারবাড়ি অবস্থিত। একে একে আমরা দেখে নিলাম চারটি ঐতিহাসিক ভবন- চৌধুরী লজ, মহারাজ লজ, আনন্দ লজ ও কালীচরণ লজ। ছুটির দিনে পরিবারকে নিয়ে এমন একটি স্থানে আপনি ভ্রমণ করতে পারেন নির্দি্বধায়।

যেভাবে যেতে হবে :ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে অপেক্ষমাণ সিএনজি বেবিট্যাক্সিযোগে (ভাড়া ৭৫ টাকা, শেয়ারে জনপ্রতি ১৫ টাকা) তিন কিলোমিটার পূর্বদিকে মহেড়া জমিদারবাড়ি। মহাসড়কে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, মহেড়া, টাঙ্গাইল নামে দিকনির্দেশনা ফলক (বিশাল সাইনবোর্ড) আছে। আর যারা উত্তরবঙ্গ থেকে আসবেন, তারা ঢাকাগামী যে কোনো বাসে টাঙ্গাইল পার হয়ে ১৭ কিলোমিটার পর নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে একইভাবে যেতে পারেন।

করটিয়া জমিদারবাড়ি
করটিয়া জমিদারি টাঙ্গাইল জেলার একটি প্রাচীন জমিদার পরিবার। এ জমিদারির পন্নী পরিবারের সাদত আলী খান পন্নী সতেরো শতকের প্রথম দিকে করটিয়াতে বসবাস শুরু করলে তারা করটিয়ার জমিদার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

যা দেখবেন :করটিয়া জমিদারবাড়ি টাঙ্গাইল শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। শহর থেকে দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার। জমিদারবাড়িটি পুটিয়া নদীর তীরে অবস্থিত। প্রথমেই করটিয়া জমিদারবাড়ির বাইরে অবস্থিত সুন্দর একটি মসজিদ দেখতে পাবেন। এটি জমিদারবাড়ির মসজিদ হলেও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। আর জমিদারবাড়িটি চারদিক প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীরের ভেতরে রয়েছে লোহার ঘর, রোকেয়া মহল, যা আগে জমিদারবাড়ির অন্দরমহল হিসেবে ব্যবহূত হতো। তবে বর্তমানে এখানে একটি স্কুলের কার্যক্রম চলছে। আরও রয়েছে রানীর পুকুরঘাট, ছোট তরফ দাউদমহল ও মোগল স্থাপত্যে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ।

কীভাবে যাবেন :সড়কপথে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের দূরত্ব মাত্র ৮৪ কিলোমিটার। টঙ্গী থেকে টাঙ্গাইল যেতে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। বাসে করেই ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলে চলে যেতে পারবেন। এর জন্য আপনাকে টাঙ্গাইল বাস টার্মিনাল, অর্থাৎ মহাখালী বাস টার্মিনালে যেতে হবে। সেখানে টাঙ্গাইল যাত্রা করার উদ্দেশে পেয়ে যাবেন নিরালা, ঝটিকা, ধলেশ্বরী, বিনিময় ইত্যাদি বাস। এ বাসগুলো নিয়মিত টাঙ্গাইলে ছেড়ে যায়। বাস ভাড়া প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা মাত্র। বাস থেকে নামতে হবে করটিয়া বাইপাসের কাছে। সেখান থেকে রিকশা করেই আপনি পৌঁছে যেতে পারবেন। রিকশা ভাড়া নেবে প্রায় ৩০ টাকা। এ ছাড়া ট্রেনে করেও টাঙ্গাইলে যেতে পারেন। ট্রেন যখন টাঙ্গাইল স্টেশনে থামবে, তখন নেমে যেতে পারবেন। অন্যান্য স্থান দেখতে চাইলে যেতে পারেন ঐতিহ্যবাহী আতিয়া মসজিদ, দেলদুয়ার জমিদারবাড়ি, মওলানা ভাসানীর সমাধি ও জাদুঘর, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আর করটিয়া সাদাত কলেজ।

নাগরপুর জমিদারবাড়ি
নাগরপুর চৌধুরীবাড়ি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায় অবস্থিত একটি জমিদারবাড়ি। ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, সুবিদ্ধা খাঁর সূত্র ধরেই চৌধুরী বংশ নাগরপুরে জমিদারি শুরু করে। চৌধুরী বংশের প্রথম পুরুষ যদুনাথ চৌধুরী। প্রায় ৫৪ একর জমির ওপর জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। অট্টালিকাটির অভ্যন্তরের কাজটি সুদৃশ্য শ্বেতপাথরের। পাশ্চত্য ও মোগল সংস্কৃতির মিশ্রণে এক অপূর্ব নান্দনিক সৌন্দর্যে নির্মিত এই চৌধুরীবাড়ি। চৌধুরীবাড়ির দক্ষিণে ১১ একর জমির ওপর একটি বিরাট দিঘি রয়েছে, এটি উপেন্দ্র সরোবর নামে পরিচিত। টাঙ্গাইল থেকে সিএনজিযোগে এখানে পৌঁছানো যায়।

ধনবাড়ী জমিদারবাড়ি
বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী উপজেলায় অবস্থিত এক ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি, যা স্থানীয়দের কাছে নবাব প্যালেস বা নবাব মঞ্জিল নামে বেশ পরিচিত।

প্রায় ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই জমিদার বংশ বা জমিদারবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিটিশদের কাছ থেকে বাহাদুর, নওয়াব, সিআইই খেতাবপ্রাপ্ত জমিদার খানবাহাদুর সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী। যিনি ব্রিটিশ শাসনামলে প্রথম মুসলিম হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রিত্বের পদ লাভ করেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম এবং বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাবক ছিলেন তিনি।

জমিদারদের বসবাসের জন্য বিভিন্ন ধরনের নকশাখচিত ছোট-বড় মিলে বিশাল এক ভবন। বাড়িজুড়ে বেশ সুসজ্জিত বাগান রয়েছে। ভবনের পূর্বদিকে প্রায় ৩০ বিঘা জায়গা নিয়ে বিশাল দিঘি রয়েছে। বাড়িটিতে আরও রয়েছে ফুলের বাগান, চিড়িয়াখানা, বৈঠকখানা, গোমস্তা, নায়েব, পাইক-পেয়াদার বসতি ঘর, কাচারি ঘর এবং দাস-দাসীদের চত্বর। এ ছাড়া প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো মোগল আদলে তৈরি করা একটি মসজিদ, যা এখানে ধনবাড়ী মসজিদ নামে পরিচিত। এ মসজিদের পাশেই নবাব আলী চৌধুরীর কবর বা মাজার রয়েছে। এখনও জমিদারবাড়ির সব স্থাপনা বেশ ভালো অবস্থায় আছে। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘লাইট হাউস’ ওই জমিদারির দেখভালের দায়িত্বে আছেন। তারা এটির নাম দিয়েছেন ‘রয়্যাল রিসোর্ট’।

কীভাবে যাওয়া যায়
মহাখালীর টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা-ধনবাড়ী সরাসরি বাস সার্ভিস চালু আছে। বিনিময়, মহানগর কিংবা শুভেচ্ছা পরিবহনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ভাড়ায় পৌঁছাতে পারবেন ধনবাড়ী। ধনবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে অদূরেই জমিদারবাড়ি। ইচ্ছা করলে হেঁটে কিংবা রিকশায় পৌঁছাতে পারেন সেখানে।

 488 total views,  6 views today

প্রকাশিত সংবাদ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি,পাঠকের মতামত বিভাগে প্রচারিত মতামত একান্তই পাঠকের, তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়।
Top